মীর তাফহীম মাহমুদ

১৪ জানুয়ারি ২০১৫, ১২:০০


বিভাগঃ শরীর বিদ্যা


স্বপ্নের রহস্যময় রহস্য


স্বপ্ন হচ্ছে আমাদের শারীরিক বিশ্রামায়িত অবস্থায় মস্তিষ্কের চিন্তাধারা। স্বপ্ন আমরা প্রতিটি মানুষি দেখি। আর এই স্বপ্ন মাঝে মাঝে সত্যিতেও পরিণত হয়।

এই স্বপ্নের সংজ্ঞা কোনো বিজ্ঞানীই ঠিক করে দিতে পারেনি। তাই আমি এই নিয়ে কিছু চিন্তা করলাম।

আমরা কখন স্বপ্ন দেখি ?

সাধারণত আমরা যখন শারীরিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ি তখন আমাদের মস্তিষ্ক ও ক্লান্ত হয়ে পড়ে। অবশ্য, মস্তিষ্ক ক্লান্ত হলেই আমাদের শারীরিক ক্লান্তি দেখা দেয়। আর এই ক্লান্তি মেটানোর জন্য আমরা যখন বিশ্রাম নিই তখনই আমরা স্বপ্ন দেখি। আমরা জাগ্রত অবস্থায় স্বপ্ন দেখিনা ।

কারন, আমরা যখন জাগ্রত থাকি এবং চোখ খুলে রাখি তখন আমাদের মস্তিষ্ক বিভিন্ন তথ্য একসাথে পায়। যেমন- আমরা সজাগ থাকা অবস্থায় অনেক কিছু দেখি, অনেক কিছু শুনি, অনেক সিদ্ধান্ত নিই, অনেক রকম কাজ করি, আমাদের স্নায়ুও নিজের মতো মস্তিষ্কে সংকেত পাঠাতে থাকে। যার ফলে মস্তিষ্ক একসাথে অনেক তথ্য পেয়ে যায় এবং মস্তিষ্ক তীব্রভাবে কোনো কিছু চিন্তা করার সুযোগ পায়না। তাই আমরা দিনের বেলা স্বপ্ন দেখিনা।

আবার, আমাদের মস্তিষ্ক যখন বিশ্রামায়িত অবস্থায় থাকে তখন সে আস্তে আস্তে অন্য কাজের কথা ভুলে যেতে থাকে আর মস্তিষ্কের চিন্তা করার কার্‌যক্ষমতা বৃদ্ধি পেতে থাকে।

অন্য কাজের কথা ভুলে যাওয়ার কারণ হচ্ছে, আমাদের মস্তিষ্ক যখন বিশ্রাম নেয় তখন এর গোপনে চিন্তা করার অংশই সজাগ থাকে। যার ফলে আমরা বিশ্রামায়িত মস্তিষ্কের চিন্তাধারা বুঝিনা। বিশ্রামায়িত অবস্থায় মস্তিষ্কের অন্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কাজ বন্ধ হয়ে যায়। তাই, আমাদের মস্তিষ্ক কোনো বিষয় নিয়ে তীব্রভাবে চিন্তা করার ও চিন্তাকে বিশ্লেষিত করে দৃশ্য তৈরী করার সুযোগ পায়, আর এই কারণেই আমরা স্বপ্ন দেখি ।

স্বপ্ন দেখার কারণঃ

স্বপ্ন দেখার কারণ হচ্ছে আমাদের মস্তিষ্কের বিশ্রামায়িত অবস্থায় তীব্র চিন্তাধারা। আমরা স্বপ্নের সাহায্যে অনেক কঠিন সমস্যা বা বিষয়ের সমাধান দেখতে পাই যা বাস্তব জীবণে বা সজাগ থাকা অবস্থায় আমরা বুঝতে পারিনা যে আমরা  স্বপ্নটি কেন দেখলাম।

স্বপ্ন দেখার মূল কারণ হচ্ছে আমাদের মস্তিষ্কের পূর্বে গৃহীত যাবতীয় তথ্য নিয়ে মস্তিষ্কের তীব্র এবং গভীর চিন্তাধারা। আমরা জাগ্রত অবস্থায় যেসব তথ্য পূর্বে দেখেছি তা নিয়ে আমাদের মস্তিষ্ক বিশ্রামায়িত অবস্থায় অনেক চিন্তা ও বিশ্লেষণ করে এবং  চিন্তা ও বিশ্লেষণ শেষে ফল প্রকাশ করে। অর্থাৎ আমাদের মস্তিষ্কের চিন্তার ফলকে দৃশ্যরূপে দেখায়।

আমরা এমনসব স্বপ্ন কেন দেখি যা আমাদের সাথে ঘটেনি?

আমরা আমাদের স্বপ্নে অনেক আগে ঘটা ঘটনাও দেখতে পাই যা আমরা ভুলে গিয়েছি, এবং শত চেষ্টা করেও মনে করতে পারিনা।

এর কারণ হলো- আমরা কোনো তথ্য একবার পেলে সেটা কখনো ভুলিনা। বিশেষ করে আমাদের যখন চেতনাবোধ জন্ম হয় সে সময়ের পর থেকে আমরা যা দেখি তা কখনো ভুলে যাই না। যদিও, আমরা মনে করি যে, আমাদের আগের অনেক তথ্য আমরা ভুলে যাই। এটা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। আমাদের চেতনাবোধ জন্ম হওয়ার পর যা দেখি আমাদের মস্তিষ্ক তা সংরক্ষণ করে রাখে। আমরা সেগুলোকে ভুলে যাই বলি কারণ, জাগ্রত অবস্থায় অনেক আগের ঘটনা আমরা মনে করতে পারিনা। কারণ জাগ্রত অবস্থায় আমাদের মস্তিষ্ক একসাথে অনেক তথ্য পায়। কিন্তু আমাদের মস্তিষ্কের বিশ্রামায়িত অবস্থায় সেগুলো চিন্তা করার সুযোগ পায় তাই আমরা সেগুলো স্বপ্নের মধ্যে দেখি।

যেমনঃ আপনি স্বপ্নে অনেক অপরিচিত মানুষ দেখেন। কিন্তু তারা কিন্তু মোটেও আপনার অপরিচিত নয়। তারা আপনার পরিচিত লোকই। কিন্তু অনেক আগের ঘটনা বলে আপনার মস্তিষ্ক তা জাগ্রত অবস্থায় চিন্তা করতে পারেনা। অনেক সময় এমনও ঘটে আপনি স্বপ্নে অনেক বাচ্চা দেখতে পান কিন্তু তাদের আপনি চিনেনা। কিন্তু এটা ঠিক নয়। আপনি তাদের চিনেন। হয়তো তারা আপনার অনেক ছোটবেলার বন্ধু অথবা অনেক ছোটবেলার আপনি।

এই কথা দ্বারা আরো একটি জিনিস প্রমাণ হয়। সেটা হলো- আপনি জাগ্রত অবস্থায় যতটুকু চিন্তা করতে পারবেন শুধু সেইটুকুই আপনি স্বপ্নে দেখলে চিনবেন। এর আগের ঘটনা দেখলে আপনার অলৌকিক স্বপ্ন বলে মনে হবে। আর সেজন্য আপনি বলেন আপনি স্বপ্নে এমন কিছু দেখেছেন যা আপনি কখনো চিন্তাও করেননি অথবা দেখেননি। তাই আমরা বলি আমরা অলৌকিক স্বপ্ন দেখতে পাই।

আমরা কোনো বিষয় নিয়ে খারাপ স্বপ্নে দেখি কেন?

আমরা জাগ্রত অবস্থায় কোনো খারাপ কিছু দেখলে বা চিন্তা করলে সেটা নিয়ে আমাদের মস্তিষ্ক তোলপাড় চিন্তা শুরু করে যা আমদের মস্তিষ্ক বিশ্রাম অবস্থায়ও করে। তাই আমরা খারাপ স্বপ্ন দেখি।

যেমন- আমরা জাগ্রত অবস্থায় অলৌকিক জিনিস চিন্তা করলে বা কোনো অলৌকিক সিনেমা বা ছবি দেখলে তা আমরা স্বপ্নেও দেখি।

আমরা অলৌকিক স্বপ্নেও কেন আমাদের পরিচিত মানুষদের অথবা নিজেদের দেখতে পাই যা কখনই আমাদের সাথে ঘটা সম্ভব নয়?

আমাদের মসিষ্ক সবসময় চায় স্বপ্নের মধ্যে চেনা পরিচিত কেউ থাকুক। তাই বিশ্রামায়িত মস্তিষ্ক যখন কোনো বিষয়কে বিশ্লেষন শেষে দৃশ্য তৈরীর সময় পরিচিত কাউকে অথবা নিজেকেই স্বপ্নের একটি চরিত্রে দিয়ে দেয় যার ফলে এমন হয়।

যেমনঃআপনি স্বপ্নে দেখলেন আপনি ছাদ থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করলেন।

আমরা অনেকসময় স্বপ্নে যে বিষয় ভালো সে বিষয় নিয়ে খারাপ, আবার যে বিষয় খারাপ সে বিষয় নিয়ে ভাল জিনিস দেখি কেন?

আমরা জাগ্রত অবস্থায় যেকোনো ভাল কাজ করতে পারি এবং শুদ্ধভাবেও কাজটি করতে পারি। কিন্তু অনেক সময় আমরা এমন অনেক ভালো/মজার কাজ করি যা আমাদের জাগ্রত অবস্থায় মনে হয় সম্পূর্ণ সঠিক। কিন্তু এর মাঝেও কোনো একটা ভুল থাকে যা আমরা জাগ্রত অবস্থায় চিন্তা করতে পারিনা। কিন্তু বিশ্রামায়িত মস্তিষ্ক সেই ভালো, আনন্দদায়ক, মজার জিনিসের গভীরে যেতে থাকে এবং নিজে নিজে বিশ্লেষন করতে থাকে। তখন যদি মস্তিষ্ক ঐ ভালো, মজার, আনন্দের বিষয়ে কোনো খারাপ কিছু থাকে বা থাকতে পারে এমন কিছু পায় তখন তার ফল আমাদের দৃশ্যরূপে প্রদর্শন করায়। অর্থাৎ আমরা জাগ্রত অবস্থায় ভালো জিনিশের চিন্তা করলেও ঘুমন্ত অবস্থায় খারাপ জিনিস দেখি।

যেমন ধরা যাক- আপনি জাগ্রত অবস্থায় কোনো এক ছোটখাটো খেলায় জিতেছেন এবং পুরস্কার স্বরূপ দশটি আইস্ক্রিম পেলেন। আর আপনি সারাদিন এই নিয়ে খুব আনন্দিত। আজকে এই বিষয় ছাড়া অন্য কিছু চিন্তা করেননি।

কিন্তু আপনি স্বপ্নে দেখতে পেলেন আপনি ‘জেলে’ আছেন। আবার সকালে উঠে দেখলেন সব ঠিকঠাক আছে। এক্ষেত্রে আপনি বলতে পারেন আপনি একটা কারণবিহীন/অলৌকিক স্বপ্নে দেখেছেন। এই নিয়ে চিন্তা করেও বুঝতে পারবেননা কেন এমন স্বপ্ন দেখলেন।

কিন্তু এই স্বপ্ন দেখার কারণ হচ্ছে মস্তিষ্কের গভীর বিশ্লেষণ। মস্তিষ্ক বিশ্রামায়িত অবস্থায় এই নিয়ে অনেক বিশ্লেষণ করেই আপনাকে এই স্বপ্ন দেখিয়েছে। বিশ্রামায়িত মস্তিষ্কের বিশ্লেষণটা হতে পারে এমন-

আপনি যে আইস্ক্রিম পেয়েছেন সেগুলো আইস্ক্রিম ছিলনা। সেগুলো ছিল নেশাজাতীয় দ্রব্য। যার ফলে পুলিশ খবর পেয়ে আপনাকে ‘জেলে’ নিয়ে গেল।

এরকম বিশ্লেষণ আমরা কখনো জাগ্রত অবস্থায় চিন্তাও করিনা। তাই আমরা একে অলৌকিক স্বপ্ন বলে থাকি। কিন্তু এই স্বপ্ন অলৌকিক নয়। এটি আপনার মস্তিষ্কের তীব্র বিশ্লেষিত স্বপ্ন।

এমনিভাবে খারাপ জিনিসেও আমরা ভালো স্বপ্ন দেখি। এই সবকিছু হয় মস্তিষ্কের তীব্র, গভীর চিন্তা ও বিশ্লেষণের ফলে।

আমরা যে স্বপ্ন দেখি তা পরবর্তিতে অনেক সময় সত্যি হয় কেন?

এর কারণও মস্তিষ্কের তীব্র বিশ্লেষন। প্রতিটি ঘটনাই ধাপে ধাপে সরল নিয়মে ঘটে। অর্থাৎ আমরা যা করি তা-ও সরল নিয়মেই চলে। কিন্তু আমরা মাঝে মাঝে এমন স্বপ্নে দেখি যা এক-দুই বছর পরও সত্য হয়। কারণ আমদের বিশ্রামায়িত  মস্তিষ্ক বর্তমান অবস্থানুযায়ী এই এক-দুই বছরের ঘটনাকে একরাতেই সরলভাবে বিশ্লেষণ করে। যার ফলে এক-দুই বছর পরের ঘটনা একরাতেই আমরা স্বপ্নে দেখি।  যা পরবর্তীতে অনেক সময় সত্যি হয়।

 

ট্যাগঃ কম্পিউটার, টিপস এন্ড ট্রিকস, ডাউনলোড