মীর তাফহীম মাহমুদ

২৭ মার্চ ২০১৫ ১২:০০


বিভাগ: প্যারাসাইকোলজি

পড়ার সময়: ৩ মিনিট


আত্মা ও প্লানচেটের রহস্যময় বিজ্ঞান


চিকিৎসাবিজ্ঞান বলে, ভূত-প্রেত সবই আমাদের মস্তিষ্কের তৈরি। বাস্তবতার সঙ্গে এর মিল নেই। তবে যারা ঘন ঘন ভূত-প্রেত বা অদ্ভুত জিনিস দেখেন তারা স্কিজোফ্রেনিয়া রোগে ভুগছেন। আসলে ভুত-প্রেত অদ্ভুত জিনিস আপনাদেরই সৃষ্টি।

আত্মা ও প্লানচেটের রহস্যময় বিজ্ঞান

আমরা সবাই কমবেশি শুনে থাকব আত্মা একবার সৃষ্টি হলে তা আর ধ্বংস হয় না। তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে  মৃত্যুর পর আমাদের আত্মা কোথায় যায়? তাই এই নিয়ে যুক্তিবাদী মানুষ যেমন চিন্তা করছেন তেমনি অযৌক্তিকেরাও চিন্তা করছেন। মানুষের কৌতূহলের তো শেষই নেই। তাছাড়া এটি আবার জড়িয়ে আছে মৃত্যুর পরের জগতের সঙ্গে। তাই মানুষ আরো বেশি কৌতূহলী এই ব্যাপার নিয়ে। অনেকে আবার বিশ্বাস করে আত্মারা আমাদের চারপাশেই চলাফেরা করে।  

যুগ যুগ আগের প্রশ্ন হলো- আমাদের চারপাশে যদি আত্মা চলাফেরা করে তাহলে আমরা নিশ্চয়ই তাদের সঙ্গে কথা বলতে পারব। সরাসরি না বলতে পারলেও আমরা নিশ্চয়ই অন্য কোনো মাধ্যমে কথা বলতে পারব। আর এই ধারণা থেকে অনেক আগের মানুষেরা শুরু করলেন আত্মাদের সাথে কথা বলার চেষ্টা। এমন করে বহু শতাব্দী চলে গেল কিন্তু তাদের চেষ্টা সফল হল না।

মানুষের এই বহু যুগের চেষ্টা মেটানোর জন্য এলেন ‘অ্যালান কারডেক’ নামক এক ব্যক্তি।

অ্যালান কারডেক:

           চিত্র: অ্যালান কারডেক

 

অ্যালান কারডেকের জন্ম হয় ১৮০৪ সালের ৩রা অক্টোবর ফ্রান্সের লিয়নে। শুরুর দিকে তিনি আইন বিভাগে পড়াশোনা করেন তার পিতা-মাতার ইচ্ছায়। কিন্তু এই বিষয়ে তার মোটেও আগ্রহ ছিল না। তার আগ্রহ ছিল বিজ্ঞানের দর্শনে। পরবর্তীতে তিনি দর্শন বিজ্ঞানের ওপর ডিগ্রি নেন।

৪৫ বছর বয়স থেকে তিনি প্রেতাত্মা সম্পর্কে আগ্রহ বোধ করলেন এবং প্রেতাত্মা সম্পর্কে গবেষণা চালালেন। তিনিও চেষ্টা করতে শুরু করলেন এমন কোনো মাধ্যম বের করতে যা তাকে আত্মাদের সঙ্গে কথা বলতে সাহায্য করবে। এই কাজে তার স্ত্রী-ও তাকে উৎসাহ দিতেন।

অবশেষে ১৮৫৩ সালের ১০ই জুন রাত ১০টা’র সময় একটা উপায়ে তিনি ও তার স্ত্রী মিলে আত্মা ডাকতে সক্ষম হন।

উপায়টির নাম হলো ‘প্লানচেট’।

প্লানচেটে বসে যেভাবে আত্মা ডাকবেন:

      

চিত্র: প্লানচেট

এই কাজ করার জন্য একাধিক মানুষ বোর্ডটির চারপাশ ঘিরে রাখতে হবে। আর লাভ আকৃতির যে একটা কাঠের টুকরো আছে (দ্বিতীয় ছবিতে) তাতে সবার হাত রাখতে হবে। এবার চোখ খুলে ধ্যান করতে থাকুন আর বলুন- এই ঘরে কোনো শুভ শক্তি আছে? থাকলে সাড়া দিন। দেখবেন ওই (লাভ) চিহ্নটি গিয়ে নিজে নিজে বসবে YES ঘরটির উপর। অর্থাৎ, একটা শুভ বা অশুভ আত্মা এই ঘরে আছে যে কিনা ওই ‘লাভ’ চিহ্নটিকে YES ঘরে নিয়ে গেল।

এখন মনে করুন আপনাদের সঙ্গে আপনাদের এক বন্ধুও এই লাভ চিহ্নটিতে হাত রেখেছে যার নাম হলো ‘গলু’। গলু’র দাদা ১৯৪২ সালে গাড়ি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে। এখন আপনারা সবাই গলু’র দাদার সঙ্গে কথা বলতে চান। সবাই মিলে ডাকুন- আপনি কি গলুর দাদা? গলুর দাদা হলে সাড়া দিন।

দেখবেন আপনাদের হাতের নিচে থাকা ‘লাভ’ চিহ্নটি YES ঘরে চলে গেছে। তার মানে হ্যাঁ গলুর দাদা আছে।

এখন আপনারা প্রশ্ন করুন- আপনি কি সুখী? এই প্রশ্নের উত্তরও দিবে একইভাবে YES।

এখন ধরুন গলুর দাদার নাম ‘কলু’।

তাহলে আত্মার প্রতি আরো বিশ্বাসী হওয়ার জন্য আপনারা প্রশ্ন করতে পারেন- আপনার নাম কী?

দেখবেন আপনার হাতের নিচের ‘লাভ’ চিহ্নটি ধীরে ধীরে প্রথমে K তারপর O তারপর L আর তারপর U ঘরে যাবে। অর্থাৎ কলুর দাদার আত্মা সত্যিই এখানে আছে যার নাম KOLU।

এখন জিজ্ঞাস করুন- আপনি কবে মারা গিয়েছেন? উত্তর পেয়ে যাবেন একইভাবে। ১৯৪২ সালে।

পরীক্ষাগুলো যদি আপনারা করে ফেলেন তাহলে নিশ্চয়ই আপনি প্রেতাত্মা সম্পর্কে বিশ্বাস স্থাপন করতে শুরু করবেন। কিন্তু আপনি যদি মনে করেন সত্যিই প্রেতাত্মা (কলুর দাদা) এই ঘরে ছিল তাহলে আরেকটা পরীক্ষা করুন।

আপনাদের মধ্যে একজন প্লানচেটের ‘লাভ’ চিহ্ন থেকে হাত সরিয়ে ফেলুন (গলু ছাড়া) এবং যে হাত সরিয়েছেন তিনি ছাড়া সবার চোখ বন্ধ করে দিন। 

এবার আগের মতো একই প্রশ্ন করুন। যিনি হাত সরিয়ে ফেলেছেন তিনি পরীক্ষা করুন আত্মারা কি আগের মতো ঠিক উত্তর দিচ্ছে?

দেখতে পাবেন চোখ বন্ধ অবস্থায় আত্মারা একটি ঠিক উত্তরও দিতে পারেনি। তার মানে কি চোখ বন্ধ করার সাথে সাথে আত্মারাও সবকিছু ভুলে গেল?

এর উত্তর দু’টি। একটি হলো ‘আত্মারা চোখ বন্ধ করলে কাজ করে না’ আর আরেকটি হলো ‘আত্মা সেখানে ছিলই না’। কিন্তু একসঙ্গে দুইটা উত্তর কীভাবে সঠিক হবে? এদের দু’টির মধ্য থেকে একটিকেই বেছে নিতে হবে যুক্তি দিয়ে। আর আমার মতে সঠিক উত্তর হলো ‘আত্মা সেখানে ছিলই না’।

এখন প্রশ্ন হলো এতক্ষণ আত্মা এতোগুলো প্রশ্নের উত্তর দিল তবুও কীভাবে আত্মাতে অবিশ্বাস করবো? কিন্তু এটা হলো আপনার মস্তিষ্কের ধোঁকা।

তাহলে কেন এমন হলো? 

ওপরের ঘটনা থেকে দেখা যাচ্ছে চোখ খোলা অবস্থায় আত্মা সঠিক উত্তর দিয়েছে কিন্তু বন্ধ অবস্থায় দিতে পারেনি।

এর কারণ হলো আমাদের মস্তিষ্কের ‘ইডিয়মোটর ইফেক্ট’। গলু যখন চোখ খোলা রেখে তার দাদাকে প্রশ্ন করলো- আপনি কি ভালো আছেন? আপনার নাম কী? আপনি কবে মারা গিয়েছেন? তখন গলুর অবচেতন মনের ইচ্ছা ছিল যে সব কিছুর যেন একটা আশানুরূপ উত্তর পায়। আর ঘটলোও তাই। এর কারণ গলুর চোখ যখন খোলা ছিল তখন সে জানত কোথায় YES কোথায় KOLU কোথায় 1942 শব্দগুলো আছে। ফলে তার অবচেতন মন তথ্য পাঠালো সব উত্তর যেন ‘হ্যাঁ বা আশানুরূপ’ হয়। অর্থাৎ, গলুর অবচেতন মন চেয়েছিল সে দেখতে চায় সঠিক ফলাফল এবং হলোও তাই। অবচেতন মনের মনের তথ্য পেয়ে গলুর মস্তিষ্কের মধ্য বাম পাশের একটি অংশে তৈরি হলো ‘ইডিয়মোটর ইফেক্ট’। 

ইডিয়মোটর ইফেক্টের ফলে গলুর শিরা ধমনি গুলো সেভাবে নড়তে লাগল যেভাবে গলুর অবচেতন মন চেয়েছিল।

কিন্তু যখন তার চোখ বন্ধ করে দেওয়া হলো তখন ‘ইডিয়মোটর ইফেক্ট’ ঠিকই কাজ করেছিল কিন্তু গলু কিছু দেখতে না পাওয়ায় ‘ইডিয়মোটর ইফেক্ট’ ঠিক জায়গায় শিরা ধমনি নিতে পারেনি তাই তখন গলু আশানুরূপ ফল পায়নি।

আর গলুর সাথে যারা লাভ চিহ্নটি ধরেছিল তাদের ভরসা ছিল গলুর উপর। তাই তাদের উপর ‘ইডিয়মোটর ইফেক্ট’ এর প্রভাব পড়েনি।

অর্থাৎ, যারা প্লানচেটে বিশ্বাস করেন তারা চোখ বন্ধ করে পরীক্ষা করে দেখতে পারেন।

চিকিৎসাবিজ্ঞান বলে, ভূত-প্রেত সবই আমাদের মস্তিষ্কের তৈরি। বাস্তবতার সঙ্গে এর মিল নেই। তবে যারা ঘন ঘন ভূত-প্রেত বা অদ্ভুত জিনিস দেখেন তবে আপনারা স্কিজোফ্রেনিয়া রোগে ভুগছেন। আসলে ভুত-প্রেত অদ্ভুত জিনিস আপনাদেরই সৃষ্টি।

তথ্যসূত্র:-

Brain Games- National Geographic channel, Google