Alvi Saadman

০৮ মার্চ ২০২০ ১২:০০


বিভাগ: প্রাণি বিজ্ঞান

পড়ার সময়: ৩ মিনিট


ক্রায়োনিক প্রিজারভেশন ও আধুনিক মমির গল্প


ক্রায়োনিক প্রিজারভেশন হলো- মারা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরকে বরফের ভেতরে সংরক্ষিত রাখা। এ পর্যন্ত ক্রায়োপ্রিজারভেশনে রাখার পর খরগোশের কিডনি পুনরায় সফলভাবে ব্যবহার করা গেছে। নেমাটোড ওয়ার্ম (এক ধরনের কৃমি), এবং কিছু পোকামাকড়ও নতুন করে জীবন ফিরে পেয়েছে।

কী হতো যদি আপনি ঘুমিয়ে পড়তেন এবং ঘুম ভেঙে উঠে দেখতেন কোনোভাবে কয়েকশ বছর ঘুমিয়েছিলেন? আপনার আশপাশের পরিচিত সব কিছু বদলে গেছে। হয়ত আপনি পৃথিবীতেই নেই, কয়েকশ আলোকবর্ষ দূরে অন্য কোনো ছায়াপথের অন্য কোনো এক গ্রহে আছেন? যদি দেখতে পেতেন আপনার বয়স ঘুমিয়ে পড়ার সময় থেকে একটুও বেড়ে যায়নি! বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর মতন লাগছে না?

হ্যাঁ, কল্পকাহিনীতে এটাই ক্রায়োজেনিক-স্লিপ, হাইপার-স্লিপ, বা ডেল্টা-স্লিপ বিভিন্ন নামে পরিচিত। না আমরা এখনো বিজ্ঞানের অতটা উচ্চতায় নিজেদেরকে নিয়ে যেতে পারিনি। তবে যতদূর যেতে পেরেছি এখনো পর্যন্ত, সেটাকে বলে ক্রায়োনিক প্রিজারভেশন।

পার্থক্য হলো, ক্রায়োজেনিক-প্রিজারভেশন করার পর আপনি আবারো জেগে ওঠার মোটামুটি নিশ্চয়তা পাবেন, কারণ সেটা অনেকটা হাইবারনেশন বা শীতনিদ্রার মতন। কিন্তু শুনতে একটু দুঃখজনক হলেও সত্যি, ক্রায়োনিক-প্রিজারভেশনের ক্ষেত্রে আপনি সেই নিশ্চয়তাটা আপাতত পাচ্ছেন না। মানে ক্রায়োনিক ঘুমের জগতে গেলে আপনাকে হয়ত আর জাগিয়ে তোলা যাবে না। অন্তত আমাদের বিজ্ঞান এখনো যে পর্যন্ত পৌঁছেছে তার সহায়তায়।

এটা আসলে এক কথায় আধুনিক সময়ের মমি। মিশরের পিরামিডের সময়ে যেমন রাজা এবং ধনী ব্যক্তিরা নিজেদের দেহ পরকালে নিয়ে যাওয়ার জন্য সংরক্ষণ করে রাখতে চাইত অনেকটা সেই রকম। তবে এই ক্ষেত্রে পার্থক্য হলো এখানে যাকে ক্রায়োনিক প্রিজারভেশনে রাখা হবে, তার দেহের বেশিরভাগ টিস্যু যাতে নষ্ট না হয়, অক্ষত থাকে সেই দিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, যাতে করে ভবিষ্যতে যদি চিকিৎসা শাস্ত্রের উন্নতি হয় এবং যেহেতু দেহের কোষগুলির তেমন কোনো ক্ষতি হচ্ছে না সেহেতু হয়ত এই দেহে আবারো হৃদ-ক্রিয়া চালু করা যাবে এবং তাকে নতুন করে বাঁচিয়ে তোলা সম্ভব হবে।

এই ধারণা যে একদম ভিত্তিহীন তা কিন্তু না। কারণ এ পর্যন্ত ক্রায়োপ্রিজারভেশনে রাখার পর খরগোশের কিডনি পুনরায় সফলভাবে ব্যবহার করা গেছে। নেমাটোড ওয়ার্ম (এক ধরনের কৃমি), এবং কিছু পোকামাকড়ও নতুন করে জীবন ফিরে পেয়েছে।

মানুষ বা বড় প্রাণীর ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ দেহ কে এভাবে এখনো পর্যন্ত সংরক্ষণের পর পুনর্জীবিত করা না গেলেও মানুষের বিভিন্ন অঙ্গ যেমন- ভ্রূণ থলি, শুক্রাণু, স্টিম-কোষ, গর্ভাশয় এর টিস্যু, ভ্রুণ, ডিম্বাণু, শুক্রাশয়ের টিস্যু ইত্যাদি কে ক্রায়ো-প্রিজারভেশনে রাখার পর তা সফলভাবে পুনরায় সংযোজন করে কর্মক্ষম করে তোলা সম্ভব হয়েছে। তাই আশা রাখা যায় যে ভবিষ্যতে চিকিৎসা শাস্ত্রের উন্নয়ন হলে এক সময় মানুষকেও পুনর্জীবিত করে তোলা সম্ভব হবে।

জীবিতদের জন্য যেহেতু সরকারি অনুমোদন নেই সেহেতু মারা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরকে বরফের ভেতরে রাখা হয় কিছুক্ষণ। অঙ্গগুলোকে ভালো রাখতে কৃত্রিমভাবে রক্ত সঞ্চালন করা হয় শরীরের ভেতর দিয়ে। তারপর ক্রায়োপ্রিজারভেশনের জন্য শরীরের ভিতর থেকে রক্ত এবং অন্য জলীয় অংশ যত বেশি পরিমাণ পারা যায় বের করে ফেলা হয়। তারপর রক্ত এবং জলীয় অংশের পরিবর্তে অঙ্গ সংরক্ষণের জন্য যে মেডিকেল গ্রেড এন্টি-ফ্রিজ দ্রবণ ব্যবহার করা হয়, সেটা শরীরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় যাতে পরবর্তীতে মৃত শরীর কে ঠাণ্ডা করা হলেও কোষের ভিতরে স্ফটিক তৈরি হতে না পারে, কারণ স্ফটিক তৈরি হলে শরীরের কোষ নষ্ট হয়ে যায়।

এরপর একজন মেডিকেল সার্জন বুকের অংশ উন্মুক্ত করে এবং প্রধান রক্তবাহী নালীগুলো থেকেও রক্ত বের করে ফেলার ব্যবস্থা করেন এবং সেখানে একইভাবে মেডিকেল গ্রেড এন্টি-ফ্রিজ দ্রবণ ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। যখন মৃতের শরীরের সবগুলো রক্তনালী যথেষ্ট এন্টি-ফ্রিজ দ্রবণে ভর্তি হয়, তখন প্রাথমিক ভাবে ড্রাই আইস (শুষ্ক কার্বন-ডাই-অক্সাইড) ব্যবহার করে প্রাথমিক পর্যায়ে মৃত শরীরের তাপমাত্রা শূন্যের ৭৮.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস নিচে নিয়ে আসা হয়, এরপর শুরু হয় তরল নাইট্রোজেন ব্যবহার করে শরীরকে ঠাণ্ডা করার প্রক্রিয়া। এবং প্রতি ঘণ্টায় শরীরের তাপমাত্রা এক ডিগ্রি সেলসিয়াস করে কমানো হয় এবং এভাবে প্রায় দুই সপ্তাহ পরে শরীরের তাপমাত্রা -১৯৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নিয়ে আসা হয় এবং এই তাপমাত্রায় শরীরকে একটা সিলিন্ডারের মতন চেম্বারে রেখে দেওয়া হয়।

আমেরিকার অ্যারিজোনা রাজ্যের এলকর (Alcor) ফ্যাসিলিটি, ক্যালিফোর্নিয়া ক্রায়োব্যাংক, ক্রায়োব্যাংক ইন্টারন্যাশনালসহ এরকম বেশ কয়েকটি জায়গাতে আপনি নিজেকে সংরক্ষণ করতে পারবেন। এলকর ল্যাবে খরচ পড়বে পুরো শরীর সংরক্ষণের জন্য দুই লাখ মার্কিন ডলার এবং শুধু মস্তিষ্ক সংরক্ষণের জন্য ৮০ হাজার ডলার।

ক্রায়োনিক্স ইন্সটিটিউট ল্যাবে খরচ কম। পুরো শরীর ২৮ হাজার ডলার। এছাড়াও সম্প্রতি এমেরিকার ‘হলব্রুকে (Holbrook) পৃথিবীর ২য় বৃহত্তর ক্রায়োনিক ফ্যাসিলিটি বানানোর প্রস্তাব সম্প্রতি গৃহীত হয়েছে।

মরার পর এভাবে শরীরকে সংরক্ষণের ফলে যেহেতু আপনার শরীরের বেশিরভাগ কোষই নষ্ট হবে না, তাই যদি ভবিষ্যতে কখনো মৃতদেহে প্রাণ সঞ্চারের উপায় খুঁজে পাওয়া যায়, তখন হয়তো আপনাকে নতুন করে বাঁচিয়ে তোলা সম্ভব হলেও হতে পারে।