Adib Akhand

০১ জানুয়ারি ২০১৫ ১২:০০


বিভাগ: জোতির্বিদ্যা

পড়ার সময়: ৪ মিনিট


জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিরা (সংক্ষেপ)


যার নাম আগে আসে তিনি হচ্ছেন থেলিস। এর পরেই আসে বিশ্বজয়ী পিথাগোরাসের নাম। প্লেটো, অ্যারিস্টটল, টলেমি, হিপ্লাকার্স, হাইপেশিয়া, আব্দুল-আল-রহমান-সুফি, নিকোলাস, জোহানেস কেপলার, গ্যালিলিও, গিওভান্নি, আইজ্যাক নিউটন, এডমন্ড হ্যালি, উইলিয়াম হার্শেল, আইনস্টাইন, ওর্ট মিল্কি ও এই শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ জ্যোতির্বিজ্ঞানী আমেরিকান কার্ল সাগানের নাম উল্লেখযোগ্য।

যার নাম আগে আসে তিনি হচ্ছেন থেলিস।  যাকে গ্রিকবাসীরা বিজ্ঞান ও গণিতের জনক বলে আখ্যায়িত করেছিলো প্রথমবার।  এমন কি তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি পৌরাণিক গল্পে গা ভাসিয়ে না দিয়ে পর্যবেক্ষণমূলক বিজ্ঞানে বিশ্বাস করতেন। যার ফলে জ্যোতির্বিজ্ঞানে অনেক উন্নতি সাধন হয়।

এর পরেই আসে বিশ্বজয়ী পিথাগোরাসের নাম।  যার কাছে গণিত ছিলো অন্ধ ধর্ম। তবে তার খারাপ দিকটা হচ্ছে তিনি পর্যবেক্ষণ নয় বরং ঘরে বসে চিন্তা-ভাবনা করে রহস্য ভেদ করতে পছন্দ করতেন।  যার ফলে তিনিও বিশ্বাস করতেন যে পৃথিবী গোল নয়, সমতল। পিথাগোরাসের মতো প্লেটোও কল্পনাবাদী বিজ্ঞান চর্চা করতেন। যার ফলে তিনিও পৃথিবীকে সমতল মনে করতেন।

তবে প্লেটোর ছাত্র আরেক বিশিষ্ট দার্শনিক অ্যারিস্টটল কিন্তু কল্পনাবাদী বিজ্ঞানের বিরুদ্ধে গিয়ে পর্যবেক্ষণমূলক বিজ্ঞানে বিশ্বাস করতেন। অ্যারিস্টটল লক্ষ্য করেন যে জাহাজ সমুদ্রবন্দর থেকে ভ্রমণ শুরু করলে সর্বশেষে তার পাল অদৃশ্য হয়। যার ফলে তিনি বুঝতে পারেন যে পৃথিবী সমতল নয় বরং গোল।  তবে এই বিষয়টি ভালোভাবে লক্ষ্য করলেও তিনি পৃথিবীকে মহাবিশ্বের কেন্দ্রে স্থান দিয়ে এক জ্যোতির্বিজ্ঞানে এক বিরাট অপব্যাখ্যা দেন।  কিন্তু আমরা পরে এই ভুলটা শুধরে নিয়েছি।

কিন্তু কে প্রথম এই মতবাদ দেন? আয়োনিয়ার স্যামোস দ্বীপের বাসিন্দা অ্যারিস্টকার্সই সর্বপ্রথম সূর্যকেন্দ্রিক মডেলের কথা বলেন। তিনি সূর্যগ্রহণ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বুঝতে পারেন যে সূর্য পৃথিবী অপেক্ষা বড়। আর বড় বস্তু কখনো ছোট বস্তুকে কেন্দ্র করে ঘুরবে না।  তবে অ্যারিস্টটলের প্রভাবের কারণে তখনকার সময়ে কেউ তার মতবাদ বিশ্বাস করেনি।  জ্যোতির্বিদ টলেমির পৃথিবী কেন্দ্রিক মডেল যে ডিফারেন্ট ও এপিসাইকেলের উপর নির্ভর করে তৈরি হয়েছিলো সেই ডিফারেন্ট ও এপিসাইকেলের প্রবক্তা হচ্ছেন আলেকজান্দ্রিয় গ্রন্থাগারের অ্যাপোলোনিয়াস।

এর পরে আসে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ জ্যোতিষ্ক পর্যবেক্ষক হিপ্লাকার্সের নাম।  যিনি তারাদের আপাত উজ্জ্বলতার উপর ভিত্তি করে তারাদের বিভিন্ন মান দেন। ইউরোপের প্রথম তারা তালিকা হিপ্লাকার্সই প্রথম প্রণয়ন করেন।

এরপরেই জ্যোতির্বিজ্ঞানের উজ্জ্বল ব্যক্তি যিনি আজ অপবৈজ্ঞানিক হিসেবেই পরিচিত, টলেমির সময়কাল আসে।  তিনি জ্যোতির্বিদ ও জ্যোতিঃশাস্ত্রবিদ ছিলেন।  তার জন্যই পৃথিবীকেন্দ্রিক মডেল ধ্রুব সত্যে পরিণত হয়।  এমনকি আকাশের জ্যোতিষ্ক দ্বারা আমরা নিয়ন্ত্রিত এই বিষয়টিও ধ্রুব সত্য বানিয়ে দেন টলেমি।  

এরপরে আলেকজান্দ্রিয়ার শেষ নক্ষত্র হিসেবে পৃথিবীতে আসেন হাইপেশিয়া।  যিনি ২য় নারী জ্যোতির্বিদ।  তিনি তেমনকিছু না করলেও আরো সুক্ষ্মভাবে তারা প্রণয়ন করেন।

এর পরে ফার্সি জ্যোতির্বিদ আব্দুল-আল-রহমান-সুফি'র (৯০৩-৯৮৬) নাম না বললেই নয়। যার নাম আজ প্রায়ই হারিয়ে গেছে।  তিনি প্রথমবার মিল্কি ওয়ে অর্থাৎ আকাশগঙার বাহিরের আরেক নক্ষত্রের জগত এ্যান্ড্রোমিডা পর্যবেক্ষণ করেছিলেন।  এরপরে অনেকদিন একজন ভালো জ্যোতির্বিজ্ঞানে অভাবে দিন কাটছিলো..............

আর সেই অভাব ঘুচাতে ১৪৭৩ খ্রিষ্টাব্দে ইউরোপের পোল্যান্ডে জন্ম নেন নিকোলাস কোপার্নিকাস। যিনি অ্যারিস্টটলের বদলে অ্যারিস্টকার্সের মতবাদকে প্রাধান্য দিয়ে একটি বই লিখেন।  যদিও তিনি দিনের পর দিন মন্দিরের উপর গবেষণা করে সূর্যকেন্দ্রিক মডেলটি প্রস্তাব করেন। ।কিন্তু তিনি সেই সময় ধর্মযাজক ছিলেন বলে তিনি বইটি প্রকাশ করতে চাননি। যদিও পরে এক শিক্ষকের জোড়াজুড়িতে তিনি প্রকাশ করেছিলেন।  তার জন্যই সূর্যকেন্দ্রিক মডেলটি প্রকাশ পায়।

এরপরে আসে জ্যোতির্বিজ্ঞানের এক মহৎ ব্যক্তির নাম, যিনি তার নিজের আবিষ্কার সম্বন্ধেই জানতেন না।  তিনি হচ্ছেন জোহানেস কেপলার (১৫৭১-১৬৩০)।। কেপলারের আবিষ্ক্রিত সেই তিনটি সূত্র, যা আজ কেপলারের সূত্র নামে পরিচিত। সেই সূত্র দ্বারা আমরা আজ গ্রহদের গতি সম্পর্কে জানতে পারি।

১৫৬৪ খ্রিষ্টাব্দে ইটালিতে জন্ম নেন আরেক জ্যোতির্বিজ্ঞানের অগ্রগতি গ্যালিলিও গ্যালিলেই। আমাদের অনেকেরই ভুল ধারণা যে গ্যালিলিও টেলিস্কোপের আবিষ্কারক। আসলে গ্যালিলিও শুধু জ্যোতির্বিজ্ঞানে টেলিস্কোপের আবির্ভাব ঘটান। আর আবিষ্কার করেন সেইসব অজানা জ্যোতিষ্ক- বৃহস্পতির উপগ্রহ ও শনি গ্রহের বলয়। যা আজ 'গ্যালিলিয়ান মুন ' নামে পরিচিত। কেপলারের মত গ্যালিলিওও কোপার্নিকাসের মতামতের পক্ষে অবস্থান করেছিলেন।

আর তারপর আসে ক্রিশ্চিয়ান হাইগেন্স (১৬২৯-১৬৯৫) এর নাম।  যিনি প্রকৃতির আলোক নিয়ে একটি থিওরির প্রস্তাব দেন, যা প্রায় দেড়শত বছর ধাঁধা ছিলো।  তিনি টেলিস্কোপের উন্নতি ঘটান এবং শনিগ্রহ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে শনির উপগ্রহ টাইটান আবিষ্কার করেন।

১৬২৫ সালে জন্ম নেন গিওভান্নি ক্যাসিনি।  যিনি শনির বলয়ের বিভাগ আবিষ্কার করেন এবং আবিষ্কার করেন শনিকে কেন্দ্র করে ঘূর্ণয়মান ৪টি উপগ্রহ।  ক্যাসিনি মিশন নামে একটি মহাকাশ মিশন রয়েছে, যা শনিগ্রহে অভিযান চালায়।

১৬৪৩ সালে জন্ম নেন বিজ্ঞানের রাজপুত্র স্যার আইজ্যাক নিউটন।  তিনি আবিষ্কার করেন মহাকর্ষণ সূত্র, যার দ্বারা প্রত্যেক গ্রহের গতি সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করা যায়।

১৬৫৬-১৭৪২ সালের মধ্যে বিখ্যাত ব্রিটিশ অ্যাস্ট্রোনমার এডমন্ড হ্যালি আবিষ্কার করেন ধূমকেতু, যা 'হ্যালির ধূমকেত' নামে পরিচিত। এই ধূমকেতু প্রত্যেক ৭২ বছর পর পর দেখা যায়।

এরপরে জ্যোতির্বিজ্ঞানের এক অভূতপূর্ব বিজ্ঞানীর জন্ম হয়, যার নাম উইলিয়াম হার্শেল (১৭৩৮-১৮২২)।  যিনি ইউরেনাস গ্রহ এবং ইউরেনাসের দুটি উপগ্রহ আবিষ্কার করেন। আবার শনি গ্রহেরও দুটি উপগ্রহ আবিষ্কারক হার্শেল।  তিনি মঙ্গলগ্রহের পোলার আইস ক্যাপ আবিষ্কার করেন যা মঙ্গলে অভিযানের জন্য আমাদের আশা জাগায়।

তিনিই প্রথম মনে করেন যে আমাদের টেলিস্কোপই একটি টাইম মেশিন।  কেননা আমরা টেলিস্কোপের সাহায্যে যেই নক্ষত্র দেখি, সেই নক্ষত্রগুল হয়ত আজ ধ্বংস হয়ে গেছে। সেই নক্ষত্রগুলোকে দেখার কারণ হচ্ছে আলো।  এমনও কিছু নক্ষত্র আমরা দেখতে পাই যে সেই নক্ষত্র ধ্বংস হয়ে গেছে মানবজাতির সৃষ্টির আগে।  তার মানে আমরা যা দেখছি তা অতীত দেখছি।  এই চিন্তাটাই প্রথমবার হার্শেলের মাথায় আসে।  

উইলিয়াম হার্শেলের বন্ধু জন মিশেল হার্শেলকে প্রথমবার ব্ল্যাক হোলের উপর কিছু ধারণা দেন। যা হার্শেল তার ছেলেকে প্রথম জানান।

১৮৭৯ সালে আমাদের সবার পরিচিত শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন। যার আপেক্ষিক তত্ত্ব দিয়ে মহাবিশ্বের রহস্য ব্ল্যাক হোল, বিগ ব্যাং ব্যাখ্যা করা যায়।  আমেরিকান বিজ্ঞানী এডুইন হাবল প্রথম লক্ষ্য করেন যে প্রত্যেকটি ছায়াপথ আরেকটি ছায়াপথ হতে দূরে সরে যাচ্ছে।  অর্থাৎ সম্প্রসারিত হচ্ছে।  তারপর তিনি বিগ ব্যাং-কে সমর্থন করে প্রতিস্থাপন করেন।

এরপর একে একে জন ওর্ট মিল্কি ওয়ের ভর গণনা করেন, জর্জ গ্যামো বলেন যে নিউক্লিয়ার ফিউশন ফলে আমরা সৌরশক্তি পেয়ে থাকি, কার্ল জান্সকি প্রথম রেডিও জ্যোতির্বিজ্ঞান আবিষ্কার করেন, জেরার্ড কুপিয়ার প্রথম ধারণা দেন যে সৌরজগতের সীমানা প্লুটো ছাড়িয়ে গেছে ও শনির উপগ্রহ টাইটানের বায়ুমণ্ডল আবিষ্কার করেন।

এরপর ক্লাইড টমবার্গ সৌভাগ্যের ভুলের কারণে প্লুটোনামক গ্রহকে আবিষ্কার করে ফেলেন।

এরপর আসেন এই শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ জ্যোতির্বিজ্ঞানী আমেরিকান কার্ল সাগান। কার্ল সাগানের লেখা ‘কসমস’ একটি জনপ্রিয় বই।

এরপর এ্যালান গুথ বিগ ব্যাং-কে সমর্থন করেন এবং বলেন যে মহাবিশ্ব সমতল ও অসীম।

এখানে উল্লেখিত ব্যক্তিবর্গই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ জ্যোতির্বিজ্ঞানীগণ, যাদের অবদানে আজ আমরা অনেক এগিয়ে। আবার শুধু যে এরা তা নয় কিন্তু, আরো অনেক জ্যোতির্বিজ্ঞানীই অবদান রেখেছে। তবে এরাই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ।